সৌরজগৎ বলতে সূর্য এবং তার মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ সকল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুকে বুঝায়। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি গ্রহ, এদের ১৮৫টি জানা উপগ্রহ, ৫টি বামন গ্রহ ও এদের ৪টি জানা উপগ্রহ এবং কোটি কোটি বস্তু। এই কোটি কোটি বস্তুর মধ্যে রয়েছে গ্রহাণু, উল্কা, ধুমকেতু এবং আন্তঃগ্রহীয় ধুলিমেঘ। সৌরজগতের রয়েছে একটি গ্রহাণু বেষ্টনী, যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথুরে বস্তু দ্বারা গঠিত এবং রয়েছে একটি দ্বিতীয় বেষ্টনী, যা কুইপার বেষ্টনী নামে পরিচিত। কুইপার বেষ্টনীতে রয়েছে বরফ শীতল পদার্থ। কুইপার বেষ্টনীর পরে রয়েছে বিক্ষিপ্ত বস্তু সমূহ, হেলিওপজ এবং সবশেষে রয়েছে উওর্ট মেঘ। মোটকথা সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ, উপগ্রহ, বামন গ্রহ ও কোটি কোটি বস্তু দিয়ে যে জগৎ গঠিত হয়েছে তাকেই সৌরজগৎ বলে। সৌরজগতে অবস্থিত গ্রহ ও বামন গ্রহ সহ অন্যান্য সকল বস্তুই (উপগ্রহ ছাড়া) সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং এগুলো মহাকর্ষণ শক্তি দ্বারা আকৃষ্ট হয়। মহাবিশ্বের বিশালতার মধ্যে সৌরজগৎ নিতান্তই ক্ষুদ্র। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের বাইরেও আরো কয়েকটি সৌরজগতের সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি গ্রহ পরিভ্রমণ করছে।
সৌরজগতের সৃষ্টি
সৌরজগতের জন্ম-রহস্য সম্পর্কে ফরাসি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী পিয়ের সিমোঁ লাপ্লাস সর্বপ্রথম ১৭৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মাথা ঘামান। সে সময়ে এই সৃষ্টি সম্পর্কিত তার মতবাদটি বেশ প্রচারিত হতে দেখা যায়। যদিও এর আগে ১৭৫৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কান্ট ও অনেকটা একই ধরনের মতবাদ প্রচার করেন। তবে লাপ্লাসের মতবাদটি প্রচারিত হওয়ার পর দুই মতবাদের মিশ্রণরূপ বিশদভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সমর্থন পায়। যে কারণে সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কিত এই তত্ত্বটিকে কান্ট-লাপ্লাস নীহারিকাবাদও বলা হয়।
এই তত্ত্বে বিজ্ঞানীদ্বয়ের ধারণা নক্ষত্রের সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় মধ্যে সৌরজগৎ সৃষ্টি। তাদের তত্ত্ব অনুসারে অনুসারে সূর্যের আদি বস্তুপুঞ্জের উত্তপ্ত নীহারিকা থেকেই সৌরজগতের সৃষ্টি।
এই তত্ত্ব অনুসারে- বিশাল হালকা গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জ ঘূর্ণিতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মাঝখানের ঘন বস্তুপিণ্ডটি আদি সূর্যের আকারে রূপ নেয়। এরপর গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জ ক্রমে ঠাণ্ডা হতে শুরু করে এবং সঙ্কুচিত বস্তুপুঞ্জের আকারে ছোট হয়ে আসে। ফলে কৌণিক ভরবেগের নিত্যটা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য ঘোরার বেগ বাড়তে থাকে এবং প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকায় নীহারিকাপুঞ্জ মসুরদানার মতো কিছুটা চ্যাপ্টা আকারের হয়ে দাড়ায়, আর ঘোরার বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তার বিষুব অঞ্চলের কেন্দ্রাতিগ শক্তি বৃদ্ধি পায়।
এই কেন্দ্রাতিগ শক্তি কেন্দ্রাভিগ মহাকর্ষের সমান হয়ে দাঁড়ানোর পর বাইরের একটি খোলস সংকোচনশীল বস্তুপুঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে তারপর আরো সঙ্কচনের ফলে অনুরুপভাবে পর পর বস্তুপুঞ্জের আরো কিছু খোলস পৃথক হয়ে যায়। এই খোলসগুলো পরে ঠাণ্ডা হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করে আর তাদের আগেকার ঘূর্ণনের ফলেই এরা গোলাকৃতি লাভ করে। এসব গোলাকৃতি সঙ্কুচিত বস্তুপিণ্ড অবশেষে সূর্যের চারদিকে গ্রহ উপগ্রহের রূপ লাভ করে।
উনিশ শতকের শেষদিক পর্যন্ত লাপ্লাসের এই মতবাদই ছিল সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রধান মতবাদ। কিন্তু ক্রমেই এই মতবাদের দুর্বল দিকগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে ধরা পড়তে শুরু করে। যেমন লাপ্লাসের হিসেবে সূর্যের চারিদিকে ঘুরন্ত গ্যাসপুঞ্জের মধ্যে যেকোনো ব্যাসার্ধরেখায় বস্তুকণার আপেক্ষিক স্থানচ্যুতি ধরা হয়নি। গাণিতিক দিক থেকে ভৌত বাস্তবতার বিবেচনায়, এ ত্রুটির কারণেই লাপ্লাস বাইরের দিকের গ্যাসকণা আর ভেতরের দিকের গ্যাসকণার তুলনামূলক গতির বিষয়টি সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছিলেন। লাপ্লাসের ধারণা সত্যি হলে সবগুলো গ্রহ উপগ্রহই তাদে কক্ষপথে ঘোরার সময় নিজের অক্ষের ওপর সামনের দিকে ঘুরবে আর উপগ্রহরা তাদের চলার বেগ পাবে প্রধাণত গ্রহের ঘোরার বেগ থেকে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলগ্রহ নিজের অক্ষের চারিপাশে যে বেগে ঘরে তার উপগ্রহ ফোবস মঙ্গলের চারপাশে ঘরে তার তিনগুণ বেগে। ইউরেনাসের উপগ্রহরা তার চারপাশে ঘরে সামনের বা পেছনের দিকে নয়, কক্ষের সাথে সমকোণে। আবার নেপচুন বৃহস্পতি ও শনির কোনো কোনো উপগ্রহ ঘরে উল্টো দিকে, অর্থাৎ গ্রহ ঘোরার বিপরীত দিকে। তাছাড়া কেন্দ্রাতিগ শক্তির টানে সূর্য থেকে বস্তুপুঞ্জ বের হয়ে যাওয়ার জন্য সূর্যের চারপাশে তাদের ঘোরার বেগ আজকের তুলনায় বহুগুণ বেশি হওয়ার কথা কিন্তু এই গতি তাদের কখনোই ছিল না।
এইসব বিভিন্ন দুর্বল দিক ধরা পড়ায় লাপ্লাস-কান্ট মতবাদটি তার জনপ্রিয়তা হারায়। ব্রিটিশ গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী জেমস জিনস ১৮১৬ সালে লাপ্লাসের তত্ত্বটি খন্ডন করে সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার মতে, দূর অতীতে সূর্যের তুলনায় অনেক বড় একটি নক্ষত্র সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার আকর্ষণের সূর্যের বস্তুপুঞ্জের সামান্য একটি অংশ (সমগ্র সৌরজগতে সর্বমোট যে পরিমান বস্তু আছে তার ৯৯.৮৭ শতাংশ রয়েছে সূর্যে, আর মাত্র ০০.৩ শতাংশ রয়েছে সৌরজগতের বাকি সব সৃষ্টিতে, সুতরাং একে সামান্য বলা চলে) খণ্ড খণ্ড আকারে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছন্ন বাষ্পীয় অংশটি পড়ে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে জমাট বেঁধে গ্রহ উপগ্রহে পরিণত হয়।
কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তত্ত্বটি তার প্রাণ হারায় কারণ সূর্যের দেহ থেকে যদি বস্তুপুঞ্জ ছিটকে গিয়েই থাকে তাহলে তাদের তো সূর্যের কাছেই থাকার কথা, বাস্তবে সূর্যের যা ব্যস তার তুলনায় বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৫০০ গুণ আর নেপচুনের ৩০০০ গুণ আর আমাদের ছায়াপথ গালাক্সিতে ১০০ কোটি নক্ষত্রের একটি করে গ্রহমণ্ডল রয়েছে আমাদের সৌরজগতের মতোই সুতরাং এই বিরল ঘটনা সবার ক্ষেত্রেই ঘটে গ্রহ উপগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব না। যে কারণে জিনসের তত্ত্বটি আর টেকেনি।
এরপর ১৯৪৩-৪৪ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ফোন ভাইতস্কার ও সোভিয়েত গণিতবিদ অটোশিট প্রায় একই সময়ে পৃথক পৃথকভাবে একই ধরনের মতবাদ প্রচার করেন। বহু পরীক্ষানিরীক্ষার পর সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে তাদের মতবাদটি বর্তমানে প্রমাণিত এবং সু-প্রতিষ্ঠিত। তাদের দুজনেরই মতে- সম্ভবত শীতল গ্যাসপুঞ্জ ও ধূলিকণা সমন্বিত এক নীহারিকা থেকেই আদিকালে সৌরজগতের উৎপত্তি হয়েছিল। এদিক থেকে তত্ত্বটি লাপ্লাসের তত্ত্বের সংশোধিত রূপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই তত্ত্বটি সৌরজগতকে সম্পূর্ণ যুক্তিতর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নানা দেশের আরো অনেক বিজ্ঞানী এই মতের সমর্থন করেন এবং নানাভাবে এই মতটির বিকাশ সাধন করেন।

0 Comments